।। খুরশিদ জামান কাকন ।।
প্রায় দু’ঘন্টা নাগাদ বিছানার এপাশ ওপাশ করেই অস্থির আশিক কিছুতেই ঘুমোতে পারে না। ঘুম আসার কোন নামগন্ধই নেই। আশিক সচারোচর দিনের বেলা ঘুমাতে অভ্যস্ত নয়। প্রতিদিন দুপুর গড়িয়ে বিকেল এলেই সে ছুটতো মাঠে বল খেলতে। বলা চলে বিকেলের জন্যই আশিকের সকাল থেকে অপেক্ষার প্রহর গুনা। কিন্ত তবে সেদিন এমন কি হলো যে আশিকের বন্ধুদের সাথে খেলা করার কোন নামগন্ধই নেই? কেনো মিছে ঘুম পারার বৃথা চেষ্টায় রত আশিক?
বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হবে হবে অবস্থা। আকাশের মেঘ গুলো কেমন যেনো কালো হয়ে ঢেকে রেখেছে চারপাশ। অচিরেই ঝর নামার আভাস পাওয়া যায়। কিন্তু সেদিকে কোন খেয়াল নেই আশিকের। কেনোনা মানুষের মন যখন খারাপ থাকে। তখন কিছু ভালো লাগে না। কোনকিছুতে মন বসে না। শুধু ভালো লাগার মধ্যে বলা যায় একাকী নিরিবিলি চুপচাপ অবস্থান করা।
আশিকের এভাবে মন খারাপ করে থাকা খুব একটা দেখা যায় না। সবসময় বন্ধুমহলের প্রিয় হাস্যজ্বল মুখটি কালো হয়ে থাকা অনেক বেমানান। কিন্তু এমন তো হবার কথা ছিলো না। যে সবসময় হাসি ঠাট্টা করে আসর জমাইতো। সেই এদিন সব কিছু থেকে বিরত থেকে ঐ আকাশের কালো মেঘের মতো নিজেকে ভার করে রেখেছে।
আশিক এবার এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। আশিক পড়াশোনায় অতোটা ভালো না হলেও খুব যে খারাপ তা কিন্তু নয়। কলেজ পড়ুয়া আশিকের আরেকটি বিশেষ গুনের কারনে বন্ধুমহল সহ সবার কাছেই সে এক প্রিয় মুখ। আর তা হলো আশিক অনেক ভালো কবিতা লেখতে পারে। একবার তার লেখা একটা কবিতা নিয়ে ব্যপক হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিলো তার কলেজে। ব্যপক প্রশংসায় ভূষিত হয়েছিলো তখন আশিক সবমহলে। এরপর থেকে আশিক নিয়মিত প্রায় প্রতিদিনই কবিতা চর্চা করে আসছিলো। আশিকের রচিত কবিতার মান নিয়ে কারোরই কোনপ্রকার সংশয় ছিলো না। এদিন সকাল থেকে আশিক অন্যদিনের তুলনায় অনেক খুশি ছিলো। কেননা সেদিন প্রথমবারের মতো কোন পত্রিকায় আশিকের কবিতা ছাপা হয়েছে। যা আশিকের জন্য অনেক বড় পাওয়া। যদিওবা আশিক এর প্রাপ্ত দাবীদার।
আশিক কলেজ যাওয়ার পথে একটি পত্রিকা কিনে নিয়ে যায়। ক্লাসের ফাকে বিরতির সময়ে আশিক তার বেষ্ট ফ্রেন্ড অরণ্যকে পত্রিকায় ছাপা অক্ষরে প্রকাশিত কবিতাটি দেখাতে গেলে তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে তারিয়ে দেই তার বন্ধু। আশিক নিজের উচ্ছাশ আনন্দ গুলো নিজের মধ্যে জমা রাখতে পারে নি। তাইতো আগে থেকে কোনকিছু না ভেবে তার বন্ধুকে দেখাতে গিয়েছিলো। কিন্তু তার বন্ধু অপমান করে বলে ” নিজের লেখা পত্রিকায় আসছে তো কি হইছে তা দেখানোর কি আছে”। আশিক তো সবার কাছে ছুটে যায়নি নিজের প্রাপ্তির খবর জানাতে। শুধু গিয়েছিলো নিজের বেষ্ট ফ্রেন্ডের সন্নিকটে। যার জন্য আশিক কিনা করেছে তা বলে শেষ করা যাবে না। আশিক তো নিজের প্রচারনা চায়নি শুধু চেয়েছিলো প্রিয় কিছু মানুষের সমর্থন ও সহযোগীতা। এটাই কি আশিকের ভুল ছিলো। যার জন্য আশিককে এমন লাঞ্চনার শিকার হতে হলো।
সন্তান পরীক্ষায় ভালো করলে সবার আগে বাড়িতে ছুটে এসে ‘মা’ মা’ চিৎকার করে নিজের ফলাফল দেখাতে চায়। কেনোনা সে তার মাকে খুশি করতে চায়। কারন সন্তান জানে তার এ ফলাফলে মা তার খুশি হবে। আশিকও হয়তো এমন ভেবে নিজের লেখা কবিতা তার ভালোলাগার বন্ধুটিকে দেখাতে গিয়েছিলো কিন্তু তাকে যে এভাবে অপমানিত হতে হবে তা তো তার ভাবনায় ছিলো না।
তবে কি আশিকের ভুল ছিলো নিজের উচ্ছাশ আনন্দ প্রকাশে নাকি তার বেষ্টফ্রেন্ড বাছাইয়ের ক্ষেত্রে?
সন্ধে গড়িয়ে রাত গভীর হলেও আশিক সেই একইভাবে চুপটি করে শুয়ে আছে তার পড়ার ঘরে। পাশের রুম থেকে তার মা খেতে ডাকলেও আশিকের কোন খেয়াল নাই সেদিকে। আশিক নিজেও জানেনা তার মুখের সাথে মিশে থাকা মায়াবী হাসি কবে নাগাদ ফিরে আসবে।
দুবছর পর ফেব্রুয়ারি মাসে আজ “একুশে বই মেলায়” আশিকের রচিত একটি একক কবিতার বই প্রকাশিত হয়। সে সুবাধে মেলায় প্রকাশিত কবিদের কবিতার মান বিবেচনায় সেরা কবির সন্মাননা আশিক পায়। যা তাকে শিক্ষামন্ত্রী নিজ হাতে তুলে দেয়। দেশবিদেশের নামিদামী সব মিডিয়া-পত্রিকায় এই নিউজে সারা পড়ে যায় সারাদেশ। হঠাৎ বিকেলবেলা আশিকের ফোনে অপরিচিত একটি নাম্বার থেকে ফোন আসে। আশিক ফোন রিসিভ করার পর বুঝতে পারে এ তার সেই হারিয়ে যাওয়া বেষ্ট ফ্রেন্ড। যে কিনা দুবছর আগে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে তারিয়ে দিছিলো তাকে। অথচ সেদিন পত্রিকায় প্রকাশিত কবিতাটি আশিক তার বেষ্টফ্রেন্ড অরণ্যকে নিয়েই লেখেছিলো। তাইতো অনেক আগ্রহ নিয়ে দেখাতে গিয়েছিলো তাকে। ফোনের ওপাশ থেকে সেরা কবি হওয়ার সুবাদে সাধুবাদ জানায় আশিকের একসময়কার প্রিয় বন্ধুটি। কিন্তু আশিক কিছু না বলে ফোনটি রেখে দেয়। আর দিবেই না বা কেনো আশিক তো এখন আর তার মন্তব্য শুনার জন্য বেকুল হয়ে থাকে না।